শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার। মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে রবিবার বিকেল থেকেই বীরভূমের বিভিন্ন শিবমন্দিরে বাড়তে শুরু করেছে শিবভক্তদের ভিড়। কাঁধে বাঁক, হাতে পুণ্যজল, খালি পায়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শিবের মাথায় জল ঢালতে ছুটছেন অসংখ্য ভক্ত। শ্রাবণের শেষ সোমবারকে ঘিরে সোমবার বীরভূমের বিভিন্ন প্রাচীন শিবমন্দিরে ভক্তসমাগম আরও বাড়বে বলে প্রশাসনের অনুমান।
বীরভূমের বক্রেশ্বর, কলেশ্বরের কলেশ্বরনাথ মন্দির, কোটাসুরের শিবমন্দির, দুবরাজপুরের জপেশ্বর মন্দির এবং বোলপুরের সুরথেশ্বর মন্দিরে ভক্তদের ঢল সামলাতে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মন্দির চত্বর ও সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ভক্তদের নিরাপত্তার দিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
শ্রাবণ মাসে শিবের মাথায় জল ঢালার রীতি ঘিরে রয়েছে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বিশ্বাস। হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় শ্রাবণ মাসকে মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয় মাস হিসেবে মনে করা হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মাসে ভক্তিভরে শিবলিঙ্গে জল, দুধ বা গঙ্গাজল অর্পণ করলে মহাদেব প্রসন্ন হন এবং ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ হয়। বিশেষ করে শ্রাবণের সোমবারকে শিবপূজার জন্য অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। তাই শ্রাবণের প্রতিটি সোমবারেই শিবমন্দিরগুলিতে ভক্তদের ভিড় বাড়ে।

শিবভক্তদের মধ্যে প্রচলিত ‘কাঁওয়ার যাত্রা’ বা বাঁক নিয়ে জল আনার রীতিও এই ভক্তিরই অন্যতম প্রকাশ। ভক্তরা বিভিন্ন পবিত্র নদী বা জলাশয় থেকে জল সংগ্রহ করে কাঁধে বাঁক নিয়ে খালি পায়ে মন্দিরে পৌঁছন এবং সেই জল শিবলিঙ্গে অর্পণ করেন। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে এই জল বহন করাকে অনেকেই ভক্তি, সংযম ও সংকল্পের প্রতীক হিসেবে দেখেন
পুরাণকথাতেও শ্রাবণ মাসের সঙ্গে মহাদেবের সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। সমুদ্র মন্থনের সময় হলাহল বিষের প্রভাবে সৃষ্ট বিপদ থেকে দেবতা ও বিশ্বকে রক্ষা করতে শিব সেই বিষ ধারণ করেন। তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়। লোকবিশ্বাসে সেই সময় শিবকে শীতল রাখতে জল ঢালার সঙ্গে শ্রাবণে শিবলিঙ্গে জল অর্পণের রীতির একটি যোগসূত্রের কথা বলা হয়। যদিও এই ব্যাখ্যার বিভিন্ন পুরাণভিত্তিক ও আঞ্চলিক রূপ রয়েছে, ভক্তদের কাছে শ্রাবণে জল ঢালা মূলত মহাদেবের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রার্থনা ও আত্মনিবেদনের প্রতীক।শেষ সোমবার হওয়ায় এদিন ভক্তসমাগম অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি হবে বলে মনে করছে প্রশাসন। সেই কারণে মন্দিরগুলিতে বাড়তি পুলিশি নিরাপত্তার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিও ভক্তদের পরিষেবা দিতে এগিয়ে এসেছে।
বোলপুরের সুরথেশ্বর মন্দিরে আগত ভক্ত এবং পথে থাকা শিবভক্তদের জন্য জল, শরবত ও খাবারের ব্যবস্থা করেছে ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ সমতা মঞ্চ। বিভিন্ন এলাকাতেও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে জলছত্র ও পরিষেবা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে শ্রাবণের শেষ সোমবারকে ঘিরে বীরভূমে একদিকে যেমন মন্দিরগুলিতে পুজো ও ভক্তির আবহ, অন্যদিকে তেমনই ভক্তদের নিরাপত্তা ও পরিষেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির তৎপরতা তুঙ্গে।





