বাইশে শ্রাবণ। বাঙালির মননে এক গভীর বিষাদের দিন। এই দিনেই চিরবিদায় নিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর প্রয়াণের ৮৬তম বর্ষে সারা রাজ্যের সঙ্গে বীরভূমজুড়েও নানা অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কবিগুরুকে স্মরণ করা হল। কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও মানবতাবাদী দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও প্রয়াস দেখা গেল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।

কবিগুরুর জন্মস্থান জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় বাইশে শ্রাবণ। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, নগর উন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল-সহ বিশিষ্টজনেরা। অন্যদিকে শান্তিনিকেতনের উপাসনা গৃহেও কবিগুরুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রবীন্দ্রনাথের কর্মভূমি বীরভূমে তাই বাইশে শ্রাবণের আবহ যেন অন্য মাত্রা পায়।
সিউড়িতেও জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত হয় বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘কথায় ও গানে’ কবিগুরুকে শ্রদ্ধা জানান সিউড়ি শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দলের শিল্পীরা। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান ও তাঁর সৃষ্টির নানা দিক উঠে আসে অনুষ্ঠানের পরিবেশনায়। উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা শাসক বুলবুল বাগচী, জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক অরিত্র চক্রবর্তী-সহ প্রশাসন ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনেরা।
অন্যদিকে সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রেরণা সিউড়ি বীরভূম-এর উদ্যোগেও সিউড়ির ডাঙ্গালপাড়ার আনন্দময়ী কালচারাল সেন্টারে শনিবার সন্ধ্যায় পালিত হয় কবিগুরুর প্রয়াণ দিবস। অনুষ্ঠানের শুরুতে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিশিষ্ট সমাজসেবী সুনয়ন ভান্ডারী।


এরপর আনন্দময়ী কালচারাল সেন্টারের শিল্পীরা রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। গানের সুরে, কবিতার আবেগে এবং স্মৃতিচারণে ফিরে আসে সেই চিরন্তন রবীন্দ্রনাথ—যাঁর সৃষ্টি বাঙালির ব্যক্তিজীবন থেকে সমাজজীবন, প্রেম থেকে প্রকৃতি, প্রতিবাদ থেকে মানবতার বোধ—সবকিছুকেই গভীরভাবে স্পর্শ করে আছে।
বাইশে শ্রাবণ তাই শুধু একজন কবির প্রয়াণের দিন নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকা একটি দিন। সময়ের স্রোতে ৮৬ বছর পেরিয়ে গেলেও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর গান এখনও মানুষের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী, তাঁর কবিতা এখনও প্রশ্ন তোলে, তাঁর চিন্তা এখনও সমাজ ও মানবতাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

সেই কারণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাইশে শ্রাবণে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো মানে কেবল অতীতের এক মহীরুহকে স্মরণ করা নয়—বরং তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি, মনন ও মানবিক চেতনাকে আরও একবার ফিরে দেখা।





