রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর বীরভূমে বালি ও পাথর ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনতে একাধিক পদক্ষেপ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ফাঁকি, নকল ডি-সি-আর এবং অবৈধ পাথর-বালি মজুদের অভিযোগে আলোচিত টুলু মণ্ডল-কাণ্ডের তদন্ত চলাকালেই প্রশাসন নতুন উদ্যোগ হিসেবে অনলাইন ডি-সি-আর ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে বাজেয়াপ্ত বিপুল পরিমাণ পাথর ও বালির নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মহম্মদবাজার ব্লকের একটি এলাকায়, যা অভিযুক্ত টুলু মণ্ডলের পার্কিং এলাকা হিসেবে চিহ্নিত, সেখান থেকে প্রায় ১৬ লক্ষ ঘনফুট পাথর বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। শুক্রবার সেই পাথরের নিলামের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর নিলাম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শুধু পাথর নয়, বালি মজুতের বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর আগে মহম্মদবাজার ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর টুলু মণ্ডল-সহ একাধিক বালি ব্যবসায়ীর ১০টি বালির স্তুপ বাজেয়াপ্ত করে। এবার টুলু মণ্ডলের কুবিলপুর ও দেউচায় বাজেয়াপ্ত বালির পাশাপাশি খয়রাশোল, দুবরাজপুর, সিউড়ি ও মহম্মদবাজারে বাজেয়াপ্ত বালির স্তুপও নিলামের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর।
এদিকে পাথর পরিবহন ও সরকারি রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে শুক্রবার মহম্মদবাজার থানার রায়পুরে পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন ডি-সি-আর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সাঁইথিয়ার বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা। প্রশাসনের দাবি, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই জেলার ১০টি চেকিং গেটে এই অনলাইন ব্যবস্থা চালু হবে। এর ফলে পরিবহন সংক্রান্ত রাজস্ব সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা পড়বে এবং জাল ডি-সি-আরের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
এর আগে সিউড়ির বিধায়ক তথা রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, বালি ও পাথর মাফিয়াদের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অবৈধ ব্যবসা রুখতেই পুলিশ ও প্রশাসন যৌথভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।
উল্লেখ্য, টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল যে তিনি রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং প্রশাসনের একাংশের সহযোগিতায় নকল ডি-সি-আর ব্যবহার করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বালি ও পাথরের ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
সম্প্রতি বীরভূম জেলা পুলিশ টুলু মণ্ডলের বাড়ি, খামারবাড়ি এবং বিভিন্ন গুদামে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, সোনা, একাধিক নথি, কথিত নকল ডি-সি-আর, বিভিন্ন গাড়ির কাগজপত্র এবং ব্যবসায়িক লেনদেন সংক্রান্ত নথি বাজেয়াপ্ত করেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়।এছাড়া মহম্মদবাজারে টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২৮.৫ লক্ষ টাকা নগদ এবং প্রায় ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার করেছে বলে পুলিশের দাবি। এই ঘটনায় মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার তাঁকে ফের আদালতে তোলা হলে বিচারক ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।
একদিকে বাজেয়াপ্ত পাথর ও বালির নিলাম, অন্যদিকে অনলাইন ডি-সি-আর ব্যবস্থা চালু—এই দুই পদক্ষেপের মাধ্যমে বীরভূমের বালি ও পাথর ব্যবসায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা স্পষ্ট বলেই প্রশাসনিক মহলের অভিমত।





