একসময় বীরভূমের রাজনীতিতে যাঁর কথাই ছিল শেষ কথা, সেই অনুব্রত মণ্ডলকে এবার সিউড়ির দলীয় কার্যালয়ের ভিতরেই আক্রান্ত হওয়ার মুখে পড়তে হল বলে অভিযোগ। বুধবার সন্ধ্যায় সিউড়িতে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে লাঠি হাতে তিন যুবকের ঢুকে পড়া, অফিসে ভাঙচুর এবং অনুব্রত মণ্ডলকে মারধরের চেষ্টার অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ অনুব্রত মণ্ডল সিউড়ির দলীয় কার্যালয়ে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা পরিষদের এক কর্মাধ্যক্ষ। এরপর একে একে সিউড়ির তৃণমূল কাউন্সিলররাও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দলীয় কার্যালয়ে আসেন। অভিযোগ, সন্ধ্যা ছটা বাজার কিছু আগে মুখে হলুদ রঙের কাপড় বাঁধা তিন যুবক লাঠি হাতে দলীয় কার্যালয়ে ঢোকে। প্রথমে নীচের তলায় এবং পরে প্রথম তলায় গিয়ে তারা অফিসের চেয়ার-সহ বিভিন্ন আসবাবপত্র এলোপাথাড়ি ভাঙতে শুরু করে। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই তারা অনুব্রত মণ্ডল যে ঘরে বসেছিলেন, সেখানে পৌঁছে যায় এবং তাঁর সামনেই টেবিল ভাঙচুর করতে শুরু করে বলে অভিযোগ। এই সময় অনুব্রতর চোখের নিচে কাচের টুকরো লাগে l
লাঠি হাতে তিন যুবকের এমন তাণ্ডবে দলীয় কার্যালয়ে থাকা তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ, এরপর অনুব্রত মণ্ডলকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য অনুব্রত মণ্ডল ঠান্ডা মাথায় তাঁদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন বলেও দলীয় সূত্রের দাবি। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ। বরং এক দুষ্কৃতী লাঠি নিয়ে অনুব্রত মণ্ডলকে মারতে উদ্যত হয়। এমনকি তাঁর জামার কলার ধরে টানাটানিও করা হয় বলে অভিযোগ। অফিসে থাকা কয়েকজন এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে তাঁদেরও গালিগালাজ করা হয় বলে দাবি তৃণমূলের।এরপরই দলীয় কার্যালয়ে থাকা কয়েকজন সিউড়ি থানায় খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। তৃণমূলের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, দুষ্কৃতীদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেয়। 
ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ‘সাজানো’ বলেও দাবি করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, দুষ্কৃতীদের সামনে অনুব্রত মণ্ডলের কার্যত নির্বিকারভাবে বসে থাকার বিষয়টিও প্রশ্ন তৈরি করছে। বীরভূম জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক শ্যামসুন্দর গড়াই বলেন অনুব্রত মণ্ডলের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে বিজেপির কোনো হাত নেই এটি ১৫ বছরের তৃণমূলের অত্যাচারের ফল যারা আক্রান্ত হয়েছেন যারা অত্যাচারিত হয়েছেন তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এটি এমনকি এই একান্তের ঘটনা কাজল ও কেষ্ট বিবাদের ফল বলছেন কেউ কেউ l
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বীরভূমের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনের ফলাফলে জেলার একাধিক আসনে বিজেপির জয় এবং তৃণমূলের পরাজয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
একসময় বীরভূমের তৃণমূল সংগঠনের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত অনুব্রত মণ্ডল দীর্ঘ সময় জেলবন্দি থাকার পর রাজনীতির ময়দানে ফেরেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে বীরভূমের সংগঠনে একাধিক সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। অনুব্রতকে ঘিরে দলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের খবরও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে।ঘটনার পর তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী নেতা কুণাল ঘোষ অনুব্রত মণ্ডলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্য, অনুব্রত কয়েকজনের চক্করে পড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে অন্য শিবিরে গিয়েছেন। সকলে একসঙ্গে থাকলে এই ঘটনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করা সম্ভব হত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে বীরভূম জেলা সিপিএম সম্পাদক গৌতম ঘোষ বলেন, দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে মারধরের সংস্কৃতি তৃণমূলই একসময় চালু করেছিল বলে তাঁদের অভিযোগ। এখন সেই সংস্কৃতিরই ফল তাঁদের ভোগ করতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বীরভূম জেলা কংগ্রেস সভাপতি সঞ্জয় অধিকারীর বক্তব্য, রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢুকে হামলা বা মারধর কোনওভাবেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত নয়। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে ধরনের অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে, তারই জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং এই ঘটনা সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টা বক্তব্যের বাইরে, সিউড়ির মতো জেলা সদর শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে প্রকাশ্যে ভাঙচুর এবং দলের প্রবীণ নেতাকে ঘিরে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া নিয়ে এলাকায় ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও কৌতূহল। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় জানতে পুলিশের তদন্তের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।




