ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমারেখা থাকলেও ভারত ও নেপালের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বকর্মা পূজা। ভারতের তথা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলকারখানা, ছাপাখানা, ওয়ার্কশপ ও মেশিনঘরে যেমন বিশ্বকর্মার মূর্তি স্থাপন করে পূজা করা হয়, তেমনই নেপালের পোখরা, কাঠমান্ডু-সহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও যন্ত্রপাতি ও যানবাহন ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনা করা হয়।
বিশ্বকর্মা পূজা একদিকে যেমন পৌরাণিক দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার স্মরণ, অন্যদিকে তেমনই আধুনিক শ্রমিক, কারিগর ও প্রযুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক বিশেষ সামাজিক পরম্পরা। ভারত ও নেপালের মানুষের মধ্যে এই উৎসব তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক যোগসূত্র তৈরি করেছে। বিশ্বকর্মা পূজায় ভারত থেকে নেপাল—সর্বত্রই দেখা যায় ঐতিহ্য, পরম্পরা ও বৈচিত্র্যের সমাগম। বিশ্বকর্মা পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রম, কারিগরি দক্ষতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি এবং মানুষের কর্মজীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ।

ঋগ্বেদের ‘বিশ্বকর্মন্’ ধারণার সঙ্গে পরবর্তী পুরাণের দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার একটি ঐতিহাসিক বিকাশগত সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী হিন্দু পুরাণ ও লোকবিশ্বাসে বিশ্বকর্মা দেবতাদের স্থপতি ও শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনিতে তাঁকে দেবাস্ত্র, প্রাসাদ, নগর এবং দিব্য যানবাহনের নির্মাতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। লোকপ্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিতে লঙ্কা, দ্বারকা, ইন্দ্রপ্রস্থ, পুষ্পক রথ, শিবের ত্রিশূল এবং বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের নির্মাণের সঙ্গেও দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার নামের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। এগুলি মূলত পৌরাণিক ও লোকবিশ্বাসের অংশ। ভারতে বিশ্বকর্মা পূজার শক্তিশালী সামাজিক প্রকাশ দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা-সহ উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। কারখানা, গ্যারেজ, ছাপাখানা, লোহার কারখানা, ওয়ার্কশপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে এই পূজা পালিত হয়। একইভাবে নেপালের কাঠমান্ডু, পোখরা এবং বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও বিশ্বকর্মা পূজার প্রচলন রয়েছে।
নেপালে বিশ্বকর্মা পূজা আসোজ ১, অর্থাৎ কন্যা সংক্রান্তির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের বহু অঞ্চলে ভাদ্র মাসের শেষ দিনে বিশ্বকর্মা পূজা পালনের ঐতিহ্য রয়েছে। দুই দেশেই পূজাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক মিলন এবং কোথাও কোথাও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন হতে দেখা যায়। নেপালে বিশ্বকর্মা পূজার দিন সরকারি ছুটিও রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পূজাকে ঘিরে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ-উৎসব এবং ঘুড়ি ওড়ানোর বিশেষ লোকাচারও রয়েছে। তবে ভারত ও নেপালের বিশ্বকর্মা পূজার কেন্দ্রে রয়েছে একই ভাবনা—‘কর্ম এবং কর্মের উপকরণের প্রতি সম্মান।’ বিশ্বকর্মা পূজাকে কেন্দ্র করে দুই দেশেই একটি গভীর দর্শন কাজ করে—যে যন্ত্র মানুষের জীবিকা সৃষ্টি করে, তাকে অবহেলা নয়, সম্মান করতে হবে। আধুনিক শিল্পসভ্যতা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মজগৎ এবং যন্ত্রনির্ভর জীবনের মধ্যেও এই ভাবনাই বিশ্বকর্মা পূজার প্রাসঙ্গিকতাকে আজও বজায় রেখেছে।
বিশ্বকর্মা পূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক শিক্ষা হতে পারে সময় ও শ্রমের মর্যাদা। একজন শ্রমিক, কারিগর, মেকানিক, চালক, প্রযুক্তিবিদ কিংবা শিল্পীর দক্ষতা সমাজ ও অর্থনীতিকে সচল রাখে। সেই শ্রম ও সৃজনশীলতাকে সম্মান জানানোর একটি সাংস্কৃতিক উপলক্ষ হয়ে উঠেছে বিশ্বকর্মা পূজা।
তাই বিশ্বকর্মা পূজা ভারত কিংবা নেপালে কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের মধ্যে শ্রমের মর্যাদা, কারিগরি দক্ষতার মূল্য, সৃজনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রযুক্তির প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলারও একটি অনন্য সামাজিক উৎসব।




