সিদ্ধিদাতা, বিঘ্ননাশক, বিদ্যার দেবতা গণেশ। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে যে কোনও শুভ কাজের সূচনায় প্রথমেই স্মরণ করা হয় গণেশকে। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে পালিত হয় গণেশ চতুর্থী। পুরাণের ঐতিহ্য পেরিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পুজো আজ পরিণত হয়েছে এক বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে। 0 গণেশকে ঘিরে রয়েছে নানা পৌরাণিক কাহিনি। শিব-পার্বতীর সন্তান গণেশকে ঘিরে হিন্দু ধর্মে রয়েছে বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। বিশ্বাস করা হয়, গণেশের আরাধনায় জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর হয় এবং সিদ্ধি ও সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হয়। সেই কারণেই ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে নতুন কোনও কাজের সূচনায় গণেশ বন্দনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে গণেশ চতুর্থীর বর্তমান জনপ্রিয়তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের এক বিশেষ উৎসব সংস্কৃতি—মুম্বইয়ের গণেশোৎসব। মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজো দীর্ঘদিন ধরেই পারিবারিক এবং সর্বজনীন দুই রূপেই পালিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের উদ্যোগে উনিশ শতকের শেষভাগে সর্বজনীন গণেশোৎসব নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও শ্রেণির মানুষকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে এই উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সময়ের সঙ্গে মুম্বইয়ের গণেশোৎসব হয়ে ওঠে এক বিশাল জনউৎসব। বিশালাকার প্রতিমা, থিমের মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা এবং বিসর্জন—সব মিলিয়ে গণেশ পুজো সেখানে কার্যত এক সামাজিক মিলনোৎসবে পরিণত হয়েছে। টেলিভিশন, সংবাদমাধ্যম এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাত ধরে মুম্বইয়ের সেই উৎসবের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
বাংলাতেও তার প্রভাব পড়েছে। দুর্গাপুজো বাঙালির প্রধান উৎসব হলেও গত কয়েক দশকে গণেশ পুজোকে ঘিরে বাংলার বিভিন্ন শহর ও মফস্সল এলাকায় নতুন করে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী মহল, শিল্পাঞ্চল, আবাসিক এলাকা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে গণেশ পুজোর আয়োজন বাড়ছে।
একসময় বাংলায় গণেশ পুজো মূলত বাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে অনেক জায়গায় তা সর্বজনীন রূপ পাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। বসছে আলোকসজ্জা। থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রসাদ বিতরণ এবং বিসর্জনের আয়োজন। বীরভূমেও বদলাচ্ছে ছবিটা l সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্তেও গণেশ পুজোর আয়োজন চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। শহর ও শহরতলির বিভিন্ন মোড়, বাজার এলাকা এবং জনবহুল স্থানে পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। মসজিদ মোড়, শরীর বাসস্ট্যান্ড, লম্বোদরপুর মোড়, রবীন্দ্রপল্লী-সহ বিভিন্ন এলাকায় গণেশ পুজোর আয়োজন নতুন করে উৎসবের আবহ তৈরি করেছে।
এই প্রসারের পিছনে একদিকে যেমন রয়েছে সর্বভারতীয় গণেশোৎসবের প্রভাব, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে স্থানীয় মানুষের উৎসাহ এবং বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগ। গণেশ পুজোকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের আগ্রহও। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণেশ পুজোর প্রকাশ্য আয়োজন আরও দৃশ্যমান হয়েছে—এমন দাবি করছেন উৎসবের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই। বর্তমান রাজ্য সরকারের সময়ে বিভিন্ন এলাকায় গণেশ পুজোর অনুমতি, প্রকাশ্য উৎসব এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে নতুন উৎসাহ তৈরি হয়েছে বলেও উদ্যোক্তাদের একাংশের বক্তব্য।
গণমাধ্যমের বিস্তার, মুম্বই ও দেশের অন্যান্য রাজ্যের উৎসব সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন রাজ্য থেকে মানুষের বাংলায় আসা-যাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব মিলিয়েই গণেশ পুজোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাংলার নিজস্ব উৎসব সংস্কৃতিতে দুর্গাপুজোর স্থান অনন্য। সেই বাংলায় গণেশ পুজোর এই নতুন বিস্তার তাই এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গোৎসবের ঐতিহ্য, অন্যদিকে যুক্ত হচ্ছে সর্বভারতীয় নানা উৎসবের নতুন রূপ।
আজকের গণেশ পুজো তাই শুধু পুরাণের গণেশ বন্দনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক মণ্ডপ, থিম, আলো, সংগীত, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং জনসম্পৃক্ততা। মুম্বইয়ের গণেশোৎসবের দৃশ্যমান জাঁকজমক বাংলার উদ্যোক্তাদেরও অনুপ্রাণিত করছে।




