অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে পড়ে বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ফায়েজুল হক ওরফে কাজল শেখ। বর্ধমান ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে তাঁর ইস্তফাপত্র জমা পড়ে এবং তা গৃহীত হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। আগামী ২১ আগস্ট কাজল শেখের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে জেলা পরিষদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই ইস্তফা দেওয়ায় ওই বৈঠকও বাতিল করা হয়েছে
জানা গিয়েছে, বুধবারই কাজল শেখ তাঁর ইস্তফাপত্র বর্ধমান ডিভিশনাল কমিশনারের দফতরে পাঠিয়েছিলেন। ইস্তফার কারণ জানতে বৃহস্পতিবার তাঁকে সশরীরে হাজির হতে বলা হয়। সেই মতো এ দিন সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ তিনি ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে হাজির হন। সেখানে কাজল জানান, সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় এবং ব্যক্তিগত কারণে তিনি পদত্যাগ করছেন। তাঁর উপর কোনওরকম চাপ সৃষ্টি করা হয়নি বলেও তিনি জানান। এরপর পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন, ১৯৭৩-এর ১৪৪(৪) ধারা অনুযায়ী তাঁর ইস্তফাপত্র গ্রহণ করা হয়।
প্রশাসনের তরফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জেলা পরিষদের সভাধিপতি হিসেবে কাজল শেখের কাছে থাকা যাবতীয় সরকারি নথি, ফাইল, সিলমোহর ও প্যাড দ্রুত জমা দিতে হবে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে জেলা পরিষদের সমস্ত দায়িত্ব এক্সিকিউটিভ অফিসারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, আপাতত বীরভূমের জেলাশাসক ধবল জৈন জেলা পরিষদের দায়িত্বভার সামলাবেন।
প্রসঙ্গত, গত ৪ আগস্ট কাজল শেখের বিরুদ্ধে বীরভূম জেলা পরিষদের ১৯ জন সদস্য অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। জেলা পরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ৫২। তাঁদের মধ্যে ৫১ জন তৃণমূলের এবং একজন কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। তৃণমূলের এক সদস্যের মৃত্যুর পর বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৫০। অনাস্থা প্রস্তাবে সাধারণ সদস্যদের পাশাপাশি কয়েক জন কর্মাধ্যক্ষও সই করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে সভাধিপতি নিয়মিত জেলা পরিষদে আসছেন না, মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ থমকে রয়েছে, বরাদ্দ টাকা পড়ে রয়েছে এবং স্থায়ী সমিতির বৈঠকও দীর্ঘদিন হয়নি।
অনাস্থা প্রস্তাব জমা পড়ার পর আগামী ২১ আগস্ট ভোটাভুটির দিন নির্ধারিত হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, অনাস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন বুঝতে পেরেই ভোটাভুটির আগেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কাজল শেখ। যদিও তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে অনাস্থা প্রস্তাবের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কাজল শেখ এখনও প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি।
বীরভূমের রাজনীতিতে বরাবরই অনুব্রত মণ্ডলের বিরোধী শিবিরের নেতা হিসেবে পরিচিত কাজল শেখ। অনুব্রত মণ্ডল গরুপাচার ও আর্থিক তছরুপের মামলায় জেলবন্দি থাকার সময় বীরভূমের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন কাজল। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি হন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে হাঁসন বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ীও হন কাজল শেখ।
তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে জেলা পরিষদের কাজে তাঁকে আর নিয়মিত দেখা যাচ্ছিল না বলে অভিযোগ। এর মধ্যেই জেলা পরিষদের বিভিন্ন কাজ ও টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বীরভূম জেলা পরিষদের কাজের অডিটও শুরু হয়। তিন সদস্যের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল ওই অডিট করে বলে জানা গিয়েছে। কয়েকটি ইজারার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মানা হয়নি এবং বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে বিজেপির অভিযোগ ।
বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কেন ইস্তফা দিয়েছেন সেটা কাজল শেখই বলতে পারবেন। তবে জেলা পরিষদকে দুর্নীতির আখড়া করে দিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় অডিট টিম কী ভাবে বেআইনি কাজ হয়েছে, তার পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। নানুরের রাস্তার টেন্ডার-সহ সব কিছুর তদন্ত হবে। ওনার দলের লোকেরাই ওনার বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেছিলেন। ভোটাভুটির আগেই ইস্তফা দিয়েছেন। তবে ইস্তফা দিয়ে পার পেয়ে যাবেন, এমনটা ভাবার কারণ নেই। রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা হবে।”
অন্যদিকে সিপিআইএমের বীরভূম জেলা সম্পাদক গৌতম ঘোষের দাবী , গোটা বিষয়টির পিছনে রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে। তাঁর কথায়, “সবটাই একটা গটাপ কেস। কাজল শেখ তো ঋতব্রত তৃণমূল। তাই হয়তো বোঝাপড়া করে ইস্তফা দিয়েছেন। কেষ্টকে খুশি রাখতে কেষ্ট অনুগামী কে বসানো হতে পারে এবং পুরোটাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে না মেনেই। এই সিদ্ধান্তের ফলে গণতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে বলে গৌতম ঘোষ বলেন বিজেপি জেলা পরিষদকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে।”
এদিকে কাজল শেখের পদত্যাগের পর বীরভূম জেলা পরিষদের পরবর্তী সভাধিপতি কে হবেন, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। সূত্রের খবর, প্রাক্তন সভাধিপতির কাছ থেকে সমস্ত নথি ও দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর জেলা প্রশাসন জেলা পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এক মাসের মধ্যে বৈঠক ডাকতে পারে। প্রয়োজনে সভাধিপতি নির্বাচনের জন্য ভোটাভুটিও হতে পারে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট জেলা পরিষদ নিজেদের দখলে রাখতে বিজেপি এমন একজন সদস্যকে সভাধিপতি করবে যিনি বিজেপির কথায় জেলা পরিষদ চালাবেন। এখন দেখার, রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে বীরভূম জেলা পরিষদ কত দ্রুত নতুন সভাধিপতি পায় এবং তার ফলে জেলা পরিষদের কাজ কতটা স্বাভাবিক হয়।




