রাজ্যের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ রাজস্ব আসে বীরভূম থেকে আর সেই বীরভূম থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে টুলু মন্ডল। কিভাবে বছরের পর বছর ফাঁকি দিয়ে এত বড় ব্যবসা চালাতেন তিনি সেই কথা শুক্রবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী।
বীরভূমের বহুল আলোচিত টুলু মণ্ডল-কাণ্ডে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুক্রবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি বৃহৎ আর্থিক চক্রের অংশ। তাঁর অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক মদত ও প্রশাসনিক প্রশ্রয়ে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে। সেই চক্রের মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দেন তিনি।
টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনার মন্ডলের বাড়ি থেকে বুধবার তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা নগদ এবং প্রায় ১৫ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় সাংবাদিক সম্মেলন করা হয় শুক্রবার। সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পাথর শিল্প থেকে সরকারি কোষাগারে প্রায় ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব জমা পড়লেও, প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা বিভিন্ন উপায়ে অন্যত্র চলে যেত।মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই পাথর শিল্প থেকে ৮০০ কোটিরও বেশি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারির প্রতিফলন ঘটেছে।তিনি বলেন, বাংলার পুলিশের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অর্থ কোথায় গিয়েছে, কার কার কাছে পৌঁছেছে, তা উদ্ঘাটিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তদন্তের স্বার্থে টুলুর একাধিক অ্যাকাউন্টে ৯৩ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে বলেও মুখ্যমন্ত্রী জানান।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মন্ডল সরকার পরিবর্তনের পর বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। তাঁর খোঁজে তল্লাশি চলছে এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।মুখ্যমন্ত্রী জানান সিউড়ি ও সোঁৎসালের বাড়ি থেকে নগদ, সোনা, প্ল্যাটিনাম, ২৪২টি গাড়ি ও বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তদন্তে এখনও পর্যন্ত ৫৩ লক্ষ টাকা নগদ, ২৬৮ গ্রাম সোনা, ৪০০ গ্রাম রুপো, ২৩ গ্রাম প্ল্যাটিনামের গয়না, টাকা গোনার যন্ত্র, ডিসিআর চালান উদ্ধার হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৮৩টি ট্রাক-সহ মোট ২৪২টি গাড়ি, যার মধ্যে বিএমডব্লিউ ও অডির মতো বিলাসবহুল গাড়িও রয়েছে। এছাড়া ২১টি সম্পত্তি, ৭টি বাড়ি, একটি ফার্মহাউস, দুটি পেট্রল পাম্প এবং প্রায় ৩০০ বিঘা জমি চিহ্নিত হয়েছে।এই ঘটনায় টুলুর হিসাবরক্ষক পিনাকী দে, সহকারী হিসাবরক্ষক রাকিবুল ইসলাম-সহ আরও পাঁচ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তে অর্থ পাচারের দিকটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলার পুলিশের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অর্থ কোথায় গিয়েছে, কারা সেই অর্থের সুবিধাভোগী এবং কারা এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত— সবই সামনে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই অভিযানে যুক্ত পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বিশেষভাবে রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক (ডিজি), বীরভূমের পুলিশ সুপার-সহ তদন্তে যুক্ত সমস্ত পুলিশ আধিকারিক ও কর্মীদের ধন্যবাদ জানান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাঁদের দক্ষতা, সততা ও নিরলস অভিযানের ফলেই বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, সোনা, সম্পত্তি এবং অবৈধ সম্পদের হদিস মিলেছে। একই সঙ্গে পাথর শিল্প থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি তদন্তকারী দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ভবিষ্যতেও একইভাবে দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। বেআইনি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে আইন অনুযায়ী নিলামে তোলা হবে। তাঁর দাবি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই ধারাবাহিক অভিযানের ফলে চলতি অর্থবর্ষের শেষে রাজ্যের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে রাজ্যের অন্যান্য অবৈধ পাথর, বালি বা রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলির উদ্দেশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের একাংশ। তদন্তের পরিধি বাড়ানো, বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং মূল অভিযুক্তের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক পদক্ষেপে একই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। প্রশাসনের বার্তা, বেআইনি উপায়ে অর্জিত সম্পদ বা রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন; তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




