প্রায় দুই দশকের টানাপোড়েনের পর বীরভূমের লোবা কয়লা খনি প্রকল্পে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকারি মধ্যস্থতায় জমির ন্যায্য মূল্য এবং পুনর্বাসন প্যাকেজ নিশ্চিত করা হলে কয়লা খনি প্রকল্প বাস্তবায়নে আর আপত্তি থাকবে না—এমনই মত প্রকাশ করেছেন এলাকার বাসিন্দারা ও লোবা কৃষি জমি রক্ষা কমিটির প্রতিনিধিরা।
২০০৭ সাল থেকে লোবা কয়লা খনি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়। গত পাঁচ বছর ধরে প্রকল্প কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দেওচা-পাচামি কয়লা খনি প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজ্য সরকার সক্রিয় উদ্যোগ নিলেও লোবা প্রকল্পে সেই ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ দীর্ঘদিন দেখা যায়নি।সূত্রের খবর, একসময় ডিভিসি (DVC) এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে গ্রামবাসীদের দাবি-দাওয়া পূরণ না হওয়া এবং প্রবল বিরোধিতার মুখে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। বর্তমানে রশ্মি গ্রুপ লোবা অঞ্চলে কয়লা খনি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। রাজ্য সরকারও এই প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। জেলা ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক দপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষি জমি রক্ষা কমিটি ও রশ্নি গ্রুপকে সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে তাদের দাবি এবং সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য বলেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার সিউড়িতে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরে অতিরিক্ত জেলাশাসক শুভম আগরওয়াল, দুবরাজপুরের বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা, লোবা কৃষি জমি রক্ষা কমিটি ,রশ্নি গ্রুপের সিনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং গ্রামবাসীদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে রশ্মি গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জয়ন্ত ঘোষ জানান, এলাকার মানুষও চান প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হোক।
তাঁর দাবি, প্রকল্প চালু হলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই রশ্মি গ্রুপ ৭১৫ একর জমি ক্রয় করেছে এবং প্রকল্পের পিছনে প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতে সরকারের উদাসীনতার কারণেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর মতে, সময়মতো এই শিল্প গড়ে উঠলে বীরভূমে আরও বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হতো। তবে বর্তমান সরকারের শিল্পোন্নয়নের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, শিল্প গড়ে উঠলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং সেই রাজস্ব উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা সম্ভব হবে।
দুবরাজপুরের বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা জানান, বৈঠকে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। কয়লা খনি প্রকল্প চালুর বিষয়ে উপস্থিত অধিকাংশই ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে শিল্প স্থাপনের পথ সুগম করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।অন্যদিকে, লোবা কৃষি জমি রক্ষা কমিটির সম্পাদক জয়দীপ মজুমদার বলেন, বৈঠক ইতিবাচক হয়েছে। তবে তাঁদের দাবি,
সরকার সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে জমি অধিগ্রহণ করবে এবং পরে কোম্পানির হাতে তুলে দেবে। পাশাপাশি কোল মাইনস আইন অনুযায়ী জমির ন্যায্য মূল্য, উপযুক্ত পুনর্বাসন প্যাকেজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অনিশ্চয়তার পর প্রশাসন, সংস্থা এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে আলোচনার নতুন পর্ব শুরু হওয়ায় লোবা কয়লা খনি প্রকল্প নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে বাস্তবে কয়লা উত্তোলনের কাজ কবে শুরু হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের আলোচনা, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং জমি সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ওপর।




