মহালয়া মানেই বাঙালির মনে শারদোৎসবের আগমনী বার্তা। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনাকে কেন্দ্র করে শনিবার ভোর থেকেই উৎসবের আবহে মেতে উঠলেন বাঙালিরা। একদিকে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ ও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার চিরাচরিত ঐতিহ্য, অন্যদিকে নদী ও জলাশয়ের ঘাটে ঘাটে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে স্মৃতিতর্পণ—মহালয়ার সকালে ধরা পড়ল বাঙালির চিরন্তন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবেগের ছবি।
ভোরের আলো ফোটার আগেই বহু বাড়িতে বেজে উঠল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র স্তোত্র, মন্ত্রোচ্চারণ ও সংগীতের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহনে শামিল হলেন অসংখ্য মানুষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির জীবনে মহালয়ার এই প্রভাতী অনুষ্ঠান এক বিশেষ আবেগের নাম। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও রেডিওতে মহালয়া শোনার ঐতিহ্য আজও অমলিন।
মহালয়ার আর এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুসারে, এদিন বহু মানুষ নদী ও জলাশয়ের ঘাটে গিয়ে তাঁদের প্রয়াত পিতৃপুরুষদের স্মরণ করেন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় জল নিবেদন করেন। এই আচার শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক স্মৃতি, শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
বীরভূম জেলার বিভিন্ন নদী ও ঘাটের পাশাপাশি খাল এবং তিলপাড়া জলাধারেও তর্পণকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাগম দেখা যায়। ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশে জলাশয়ের ধারে দাঁড়িয়ে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করেন অনেকে। মহালয়ার এই আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্যও নতুন করে স্মরণ করা হয়।একদিকে পিতৃপক্ষের সমাপ্তি, অন্যদিকে দেবীপক্ষের সূচনা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই মহালয়ার বিশেষ তাৎপর্য। পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে অতীতকে স্মরণ এবং দেবী দুর্গার আগমনী বার্তার মধ্য দিয়ে নতুন আনন্দকে স্বাগত জানানোর এই দিনটি বাঙালির জীবনে তাই একই সঙ্গে স্মৃতির, শ্রদ্ধার ও আশার।
শারদোৎসবের প্রাক্কালে মহালয়া যেন বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয়, উৎসব কেবল আনন্দের নয়, তা শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরাবিষ্কারেরও উপলক্ষ। রেডিওর পরিচিত সুর থেকে নদীর ঘাটে তর্পণ—সব মিলিয়ে মহালয়ার সকাল আজও বাঙালির সংস্কৃতি ও আবেগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।





