প্রথম পাতা সংবাদ ব্রেকিং নিউজ বিশেষ প্রতিবেদন জাতীয় রাজ্য জেলা বিনোদন সাহিত্য ও সংস্কৃতি খেলাধুলা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি স্বাস্থ্য ভিডিও গ্যালারি সমাজসেবা মতামত
BREAKING NEWS:

মহাধুমধামে পালিত বীরভূমের বগা উৎসব

ভাদ্রের মনসা আরাধনায় লোকবিশ্বাস, আচার ও অন্ত্যজ সমাজের ঐতিহ্য হল বগা উৎসবlভাদ্র মাস এলেই বীরভূমের গ্রামবাংলার কোথাও কোথাও দেখা যায় এক বিশেষ লোকউৎসবের আবহ। ঢাক-ঢোল, গান, নাচ, পুজোর আয়োজন আর সামাজিক মিলন—সব মিলিয়ে মহাধুমধামের সঙ্গে পালিত হয় বগা পুজো। লোকসমাজে এটি মূলত মনসা পুজোরই এক বিশেষ লোকায়ত রূপ হিসেবে পরিচিত। বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে অন্ত্যজ ও নিম্নবর্গের মানুষের সামাজিক জীবনে এই পুজোর রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রভাব।বগা পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাপ, প্রকৃতি, কৃষিজীবন এবং মানুষের নিরাপত্তাকে ঘিরে প্রাচীন লোকবিশ্বাস। বর্ষাকালে গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট, পুকুরপাড়, ঝোপঝাড় ও কৃষিজমিতে সাপের উপদ্রব বেড়ে যেত। ফলে সাপের দেবী হিসেবে মনসার আরাধনা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে ওঠে। সেই বিশ্বাস থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে মনসা আরাধনার নানা স্থানীয় রূপের জন্ম হয়েছে।

বীরভূমের বগা পুজোও সেই লোকঐতিহ্যের ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। বাংলার মনসা-মঙ্গল কাব্য ও লোককথায় দেবী মনসা মূলত সাপের দেবী এবং বিষহরী হিসেবে পরিচিত। সাপের দংশন থেকে রক্ষা, পরিবার ও গৃহস্থের মঙ্গল এবং সন্তান-সন্ততির কল্যাণ কামনায় তাঁর পুজো প্রচলিত হয়েছে। মনসা-মঙ্গল কাহিনিতে চাঁদ সদাগর ও বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি দেবী মনসার মাহাত্ম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। লখিন্দরের সাপের দংশন এবং বেহুলার দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি বাংলার লোকসাহিত্য ও ধর্মবিশ্বাসে মনসা আরাধনার গুরুত্বকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে। বগা পুজো মূলত লোকবিশ্বাস ও স্থানীয় সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা একটি পুজো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত বিশ্বাস, মানত, আচার এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই এই উৎসব তার নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে।বর্ষার শেষভাগ ও ভাদ্র মাস বাংলার কৃষিজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। মাঠে তখন ফসল, চারদিকে জল-কাদা, গর্ত ও ঝোপঝাড়ে সাপের বিচরণও বেড়ে যায়। কৃষিনির্ভর মানুষের জীবনে সাপের উপস্থিতি ছিল বাস্তব বিপদের কারণ।

এই প্রাকৃতিক বাস্তবতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে মনসা আরাধনাকে গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাই ভাদ্র মাসের বগা পুজোকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, কৃষিজীবন, প্রকৃতি ও মানুষের নিরাপত্তাবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি লোকসংস্কৃতি হিসেবেও দেখা যায়।বগা পুজোর নির্দিষ্ট রীতি সব এলাকায় এক নয়। অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও মাটির প্রতিমা, কোথাও ঘট, আবার কোথাও সর্পচিহ্ন বা দেবীর প্রতীককে কেন্দ্র করে পুজো হয়।পুজোর আগে বাড়িঘর ও পুজোর স্থান পরিষ্কার করা, পুজোর উপকরণ সংগ্রহ, মানত করা এবং আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানানোর রীতি রয়েছে বহু এলাকায়। পুজোর দিনে দেবীকে ফুল, ফল, ধূপ-দীপ, নৈবেদ্য প্রভৃতি নিবেদন করা হয়। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ভোগ বা প্রসাদের ব্যবস্থাও থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকে মানত। দীর্ঘদিনের অসুখ, সাপের ভয়, পারিবারিক অশান্তি কিংবা সন্তানের মঙ্গল কামনায় মানুষ দেবীর কাছে মানত করেন। মানত পূর্ণ হলে পরবর্তী বছরে বিশেষভাবে পুজো দেওয়ার রীতিও লোকসমাজে প্রচলিত।বগা পুজোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল—এটি শুধু দেবীর আরাধনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পুজোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সামাজিক উৎসব।গ্রামের বিভিন্ন পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা একত্রিত হন। কোথাও গান-বাজনা, কোথাও লোকনৃত্য, কোথাও মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। পুজোর দিনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর পরিজনদের দেখা হওয়া এবং সামাজিক সম্পর্ক পুনর্নবীকরণের সুযোগ তৈরি হয়।এই কারণেই বগা পুজোকে বীরভূমের অন্ত্যজ সমাজের সামাজিক সংহতির অন্যতম লোকায়ত উৎসব হিসেবেও দেখা যায়।বাংলার গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব দেবদেবী ও পুজো-পার্বণ সামাজিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থেকেছে। বগা পুজোও তেমনই একটি ঐতিহ্য।বিশেষত যে সমস্ত সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, তাদের কাছে নিজস্ব পুজো ও উৎসব ছিল নিজেদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক অস্তিত্ব প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।পুজোর আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ নিজেরাই দায়িত্ব ভাগ করে নেন—কে পুজোর সামগ্রী আনবেন, কে মণ্ডপ সাজাবেন, কে প্রসাদের ব্যবস্থা করবেন, কে গান-বাজনার আয়োজন করবেন। ফলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় সমষ্টিগত অনুষ্ঠানে l

বগা পুজোর মতো উৎসবের গুরুত্ব এখানেই যে, এর অনেক ইতিহাস লিখিত নথিতে পাওয়া যায় না। মানুষের মুখে মুখে, পারিবারিক স্মৃতিতে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই এর ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে।কোনও কোনও গ্রামের বয়স্ক মানুষই জানেন তাঁদের এলাকায় কত প্রজন্ম ধরে এই পুজো হয়ে আসছে, কীভাবে আগে পুজো হত, কী কী নিয়ম ছিল এবং সময়ের সঙ্গে কী পরিবর্তন হয়েছে। ফলে বগা পুজো আসলে বীরভূমের মৌখিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির একটি জীবন্ত দলিল।সময়ের সঙ্গে বগা পুজোর আয়োজনেও পরিবর্তন এসেছে। আগের তুলনায় পুজোর মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, মাইক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য আয়োজন অনেক বেশি আধুনিক হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘট আনতে যাওয়ার সময় ঢাক ঢোল সঙ নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয় lতবু মূল বিশ্বাসটি এখনও অটুট—দেবী মনসার কাছে পরিবারের মঙ্গল, রোগ-ব্যাধি ও বিপদ থেকে রক্ষা এবং শান্তি কামনা।বীরভূমের গ্রামীণ সমাজে তাই বগা পুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক, কৃষিজীবনের বাস্তবতা, লোকসাহিত্য, সামাজিক সংহতি এবং প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির এক সম্মিলিত প্রকাশ।ভাদ্র মাসে যখন গ্রামবাংলার অন্যত্র নানা পুজো-পার্বণের প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন বীoʻরভূমের বহু গ্রামে বগা পুজোর ঢাকের শব্দও মনে করিয়ে দেয়—বাংলার লোকসংস্কৃতি এখনও বেঁচে আছে মানুষের জীবনযাত্রার গভীরে। শাস্ত্রের পাতার বাইরেও যে ধর্মবিশ্বাস মানুষের দৈনন্দিন জীবন, প্রকৃতি এবং সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে মিশে থাকে, বগা পুজো তারই এক অনন্য উদাহরণ।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Follow Facebook

Follow Now

Subscribe Youtube

Subscribe