প্রথম পাতা সংবাদ ব্রেকিং নিউজ বিশেষ প্রতিবেদন জাতীয় রাজ্য জেলা বিনোদন সাহিত্য ও সংস্কৃতি খেলাধুলা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি স্বাস্থ্য ভিডিও গ্যালারি সমাজসেবা মতামত
BREAKING NEWS:

*তারাপীঠে মহামিলনের কৌশিকী অমাবস্যা :অন্ধকারের রাতে শক্তির আরাধনা* 

ভাদ্র মাসের অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই, চারদিকে অন্ধকার। অথচ এই অন্ধকারের রাতেই বাংলার অন্যতম শক্তিপীঠ তারাপীঠে জ্বলে ওঠে হাজার হাজার প্রদীপ। দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অগণিত ভক্ত। মন্দিরে শুরু হয় বিশেষ পুজো, আরতির আয়োজন। অন্যদিকে তারাপীঠের মহাশ্মশানে সাধক-সন্ন্যাসীদের তন্ত্রসাধনা ঘিরে তৈরি হয় এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক আবহ। এই বিশেষ তিথিই কৌশিকী অমাবস্যা, তারাপীঠের ভাষায় যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘তারা রাত্রি’র মাহাত্ম্য।২০২৬ সালে কৌশিকী অমাবস্যার মূল তিথি ১০ সেপ্টেম্বর। পঞ্জিকা অনুসারে অমাবস্যা তিথি ১০ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত থাকছে; রাতের নিশিপুজোর কারণে ১০ সেপ্টেম্বর রাতকেই মূল সাধনা ও আরাধনার সময় হিসেবে ধরে নিয়েই লক্ষালক্ষাধিক ভক্তদের আগমন  তারাপীঠে।কেন ‘কৌশিকী’ অমাবস্যা? ‘কৌশিকী’ নামটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবী মহামায়ার এক পৌরাণিক কাহিনি। দেবী মাহাত্ম্য-এর সঙ্গে সম্পর্কিত শাক্ত পরম্পরায় বলা হয়, শুম্ভ ও নিশুম্ভের অত্যাচারে দেবতারা যখন বিপর্যস্ত, তখন দেবীশক্তির বিশেষ প্রকাশ ঘটে। দেবীর দেহকোষ থেকে প্রকাশিত সেই শক্তির নাম কৌশিকী।সেই পৌরাণিক কাহিনি থেকেই কৌশিকী নামের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে শাক্ত সম্প্রদায়ের বিশ্বাস। পরবর্তী কালে বাংলার শাক্ত ও তান্ত্রিক পরম্পরায় ভাদ্র অমাবস্যার সঙ্গে এই কাহিনির বিশেষ যোগ তৈরি হয়।তবে কৌশিকী অমাবস্যার সঙ্গে তারাপীঠের সম্পর্কটি শুধু পুরাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।এরসঙ্গেযুক্ত হয়েছে স্থানীয় সাধনা-পরম্পরা, লোকবিশ্বাসএবং সাধক বামাক্ষ্যাপার সাধনা। তারাপীঠের কৌশিকী অমাবস্যার মাহাত্ম্য বললেই উঠে আসে সাধক বামাক্ষ্যাপার নাম।জনশ্রুতি, তারাপীঠ মহাশ্মশানের শ্বেতশিমূল বৃক্ষের তলায় কৌশিকী অমাবস্যার রাতে বামাক্ষ্যাপা গভীর সাধনায় নিমগ্ন হয়েছিলেন।সেই সাধনায় মা তারার দর্শন ও সিদ্ধিলাভকরেন এমন বিশ্বাস আজও ভক্তদেরমধ্যে প্রবল।এইকারণেই তারাপীঠে কৌশিকীঅমাবস্যা সাধারণ অমাবস্যার মতোনয়।এটি হয়ে উঠেছে সাধনা,শক্তিআর মাতৃভক্তির বিশেষ রাত্রি।

তারাপীঠের মন্দিরের পাশেই মহাশ্মশান। সাধারণ মানুষের চোখে শ্মশান মৃত্যুর স্থান। কিন্তু তন্ত্রসাধনায় শ্মশানের অর্থ আরও গভীর।তান্ত্রিক দর্শনে শ্মশান মানুষকে জীবনের অনিত্যতার কথা মনে করিয়ে দেয়। দেহ, সম্পদ, অহংকার, সামাজিক পরিচয়—সবকিছুর শেষ পরিণতি সেখানে একাকার হয়ে যায়। সেই উপলব্ধিকে সামনে রেখেই তান্ত্রিক সাধক ভয়, মোহ ও অহংকার অতিক্রমের সাধনা করেন। তাই কৌশিকী অমাবস্যার রাতে তারাপীঠের মহাশ্মশান হয়ে ওঠে তান্ত্রিক সাধনা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সাধারণ ভক্তের কাছে এই দিনটি মূলত মা তারার আরাধনা, প্রার্থনা, দান ও আত্মশুদ্ধির দিন।ভোরে মঙ্গলারতি দিয়ে শুরু হয় বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন। মায়ের শিলামূর্তিকে স্নান করানো, বিশেষ সাজসজ্জা, শীতল ভোগ, রাজভোগ এবং পরবর্তী সময়ে বিশেষ পুজো ও নিশিপুজোর আয়োজন থাকে।ভক্তরা ফুল, ফল, মিষ্টি, ধূপ ও প্রদীপ নিবেদন করেন। ১০৮টি রক্তজবা নিবেদনের বিশেষ প্রচলনও রয়েছে। তারাপীঠের ভোগপরম্পরায় ভাত, পোলাও, ডাল, তরকারি, মাছ, মিষ্টি, পায়েসসহ বিভিন্ন পদ নিবেদনের কথাও জানা যায়।কৌশিকী অমাবস্যা মানেই প্রত্যেককে উপবাস করতে হবে—এমন কোনও সর্বজনীন নিয়ম নেই। বিশেষ করে তারাপীঠে দীর্ঘক্ষণ ভিড়ের মধ্যে থাকা, রাত জাগা এবং শারীরিক পরিশ্রমের কথা মাথায় রেখে অসুস্থ, বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।আসলে এই তিথির মূল কথা ভক্তি ও সাধনা, না খেয়ে থাকা নয়।কৌশিকী অমাবস্যার সঙ্গে তন্ত্রসাধনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তন্ত্রের বিশেষ মন্ত্র, যন্ত্র, হোম, শ্মশানসাধনা বা অন্য কোনও গূঢ় আচরণ সাধারণ মানুষের নিজের ইচ্ছায় করা উচিত নয়।দীক্ষিত সাধকের জন্য নির্দিষ্ট গুরুপরম্পরা ও সাধনপদ্ধতি রয়েছে। তাই সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কোনও তথাকথিত ‘তান্ত্রিক ক্রিয়া’ অনুসরণ না করে সাধারণ ভক্তদের উচিত মন্দিরের নিয়ম মেনে মা তারার আরাধনা করা।

তারাপীঠের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দ্বারকা নদীও কৌশিকী অমাবস্যার সঙ্গে যুক্ত। ভক্তদের একটি অংশ এই তিথিতে নদীতে স্নান করে মা তারার দর্শনে যান। লোকবিশ্বাসে এই স্নানের বিশেষ পুণ্যফল রয়েছে।তবে ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করার পাশাপাশি বর্ষাকালে নদীর জলস্তর ও স্রোতের বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। রাজ্যে পরিবর্তনের পাশাপাশি দ্বারকা নদীর ধারে বেনারসের গঙ্গা আরতির আদলে বুধবার সন্ধ্যায় আরতি অনুষ্ঠান হয়েছে যা দেখতে বহুভক্ত সমাগম হয়েছিল নদী তীরে।কৌশিকী অমাবস্যা আজ আর কেবল একটি ধর্মীয় তিথি নয়। তারাপীঠকে কেন্দ্র করে এটি পরিণত হয়েছে বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমাবেশে।দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হন। স্থানীয় মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হন। ফুল, প্রসাদ, পুজোর সামগ্রী, খাবারের দোকান, হোটেল, লজ, পরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে।অর্থাৎ ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কৌশিকী অমাবস্যার গুরুত্ব অপরিসীম।

এবারের কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে তারাপীঠে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিপুল ভক্তসমাগমের সম্ভাবনায় পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বুধবার উদ্বোধন করা হয়েছে কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে মহা পূর্ণ মহোৎসবের। কৌশিকী অমাবস্যায় ভিড় এড়াতে ও নিরাপত্তায় রয়েছেন প্রায় চারহাজার পুলিশ কর্মী। খোলা হয়েছে ৮ টি সেবা শিবির, রয়েছে ২৭ টি পুলিশ সহায়তা কেন্দ্র ড্রোন ও ৪০০ সিসিটিভির নজরদারি, পুলিশ মোতায়েন এবং বিভিন্ন পরিষেবা কেন্দ্রের ব্যবস্থার কথাও প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে উঠে এসেছে। বিজেপির পক্ষ থেকে ভক্তদের জন্য পায়েসের ব্যবস্থা করা হয়েছে বিধায়ক ধ্রুবসাহা জেলা সাধারণ সম্পাদক শ্যামসুন্দর গরাই প্রমুখ  বিজেপি নেতৃত্ব নিজেদের হাতে করে সে পায়েস বিলি করেছেন।

পূর্ব রেলের পক্ষ থেকেও ১০ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর হাওড়া-রামপুরহাট রুটে বিশেষ ট্রেন চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। নিয়মিত ট্রেনেও অতিরিক্ত সাধারণ কামরা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু পূর্বে তারাপীঠের হোটেলের আগুন লাগার ঘটনায় টনক নড়েছে প্রশাসনের। তাই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে তারাপীঠে নামানো হয়েছে রোবট ইঞ্জিন রয়েছেন ২০০ জন দমকল কর্মীও। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণামত এবার এই প্রথম তারাপীঠে কৌশিকী অমাবসায় হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পদৃষ্টি করা হবে ফলে ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি তীর্থযাত্রীদের কাছে এবারের আয়োজন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।কৌশিকী অমাবস্যার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত অন্ধকারের মধ্যেই আলো খোঁজা।অমাবস্যার রাত মানে চাঁদের অনুপস্থিতি। কিন্তু শাক্ত সাধনায় সেই অন্ধকারই আত্মঅনুসন্ধানের প্রতীক। বাইরের আলো যখন নিভে যায়, তখন মানুষ নিজের ভিতরের আলোকে খুঁজতে শেখে—এমনই ব্যাখ্যা দেন সাধনা-পরম্পরার অনুসারীরা।মা তারা তাই শুধু বিপদ থেকে রক্ষা করার দেবী নন, ভক্তের কাছে তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়ার শক্তির প্রতীক। কৌশিকী অমাবস্যাকে ঘিরে অলৌকিক ঘটনা, সিদ্ধিলাভ, মনোবাসনা পূরণ কিংবা নানা তান্ত্রিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এগুলি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা ও সাধনপরম্পরার অংশ। এগুলিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।কিন্তু বিশ্বাসের সামাজিক ও মানসিক প্রভাবকে অস্বীকারও করা যায় না। বিপদের সময় কোনও শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ, প্রার্থনা এবং নিজের ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলার বিশ্বাস বহু মানুষের মনে আশাবাদ ও মানসিক স্থিরতা তৈরি করে।

কৌশিকী অমাবস্যা শুধুই একটি অমাবস্যা নয়। এটি একদিকে দেবী কৌশিকীর পৌরাণিক স্মৃতি, অন্যদিকে মা তারার আরাধনা; একদিকে বামাক্ষ্যাপার সাধনার কিংবদন্তি, অন্যদিকে তন্ত্রসাধনার গভীর পরম্পরা। আবার একই সঙ্গে এটি হাজার হাজার সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, আবেগ, প্রার্থনা এবং মিলনমেলার দিন।

তারাপীঠের মন্দিরে যখন রাত গভীর হয়, চারপাশে অমাবস্যার অন্ধকার আরও ঘন হয়, তখনও জ্বলতে থাকে অসংখ্য প্রদীপ। অন্ধকারের সেই রাতেই তাই তারাপীঠে মানুষ খোঁজেন আলোর পথ—নিজের ভিতরে, নিজের বিশ্বাসে এবং মহাশক্তির আশ্রয়ে। মহাশ্মশানে চলে সাধনা, মন্দিরে মাতৃআরাধনা, আর বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—“জয় তারা, জয় মা তারা।”

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Follow Facebook

Follow Now

Subscribe Youtube

Subscribe