
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর দিনেই যেন ইতিহাসের নতুন পাতা উল্টে গেল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, উত্তেজনা, প্রতীক্ষা এবং পালাবদলের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শনিবার ঐতিহাসিক বিগ্রেড গ্রাউন্ডে পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন শুভেন্দু অধিকারী। শপথ বাক্য পাঠ করান পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর এন রবি । স্বাক্ষর করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । সূচনা হলো নতুন এক অধ্যায়ের। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করল ভারতীয় জনতা পার্টি।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকেই সারা রাজ্যের পাশাপাশি কলকাতা শহরে ছিল উৎসবের আবহ। রাজভবন ,বিধানসভার পাশাপাশি ব্রিগেড জুড়ে চারপাশে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিজেপি কর্মী, সমর্থক, সাংস্কৃতিক জগতের মানুষ, শিক্ষাবিদ, শিল্পী এবং বিশিষ্ট নাগরিকেরা উপস্থিত ছিলেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিজেপি শাসিত কুড়িটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, জয়ী বিধায়ক এবং রাজ্যের বিজেপি সাংসদরা। জাতীয় রাজনীতির এক বৃহৎ মঞ্চে পরিণত হয়েছিল আজকের কলকাতা।
হুট খোলা গাড়িতে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য ও পরিষদীয় দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কে সঙ্গে নিয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ব্রিগেড মঞ্চে আজ শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের ছবি নয়, উঠে এল বাংলার সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক বিশেষ প্রকাশ। মঞ্চে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, শ্রদ্ধা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।
বিগ্রেড গ্রাউন্ড জুড়ে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে ছিল মেলার আবহাওয়া ও উৎসবের আমেজ। বাঙালিয়ানার আবহে হল শপথ অনুষ্ঠান সমগ্র ব্রিগেডের বিভিন্ন জায়গায় কেন হয়েছিল বিভিন্ন স্টল, বাংলার পছন্দের খাবার, মিষ্টি ,ঝালমুড়ি ছিল এবারের বিশেষ আকর্ষণ ।রবীন্দ্রনাথের গান বাংলার লোকনৃত্য , বাংলার বিভিন্ন স্থাপত্য, মন্দির দিয়ে সাজানো হয়েছে বিগ্রেডের চত্বর যা মেলার আবহাওয়া উৎসবের আমেজকে মনে করিয়ে দিয়েছে বারবার।

২৫শে বৈশাখে বিজেপির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান, তাই ব্রিগেড জুড়ে বেজেছে রবীন্দ্র গান — “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।” মঞ্চসজ্জায় আলপনা, নকশিকাঁথা ও বাংলার লোকশিল্পের ছোঁয়া।
প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গী প্রবীণব্যক্তিত্ব মাখননাথ সরকারকে উত্তরীয় পরিয়ে আলিঙ্গন করে নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানান । সেই দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল বিজেপির পক্ষ থেকে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি মননের প্রতি এক প্রতীকী সম্মান প্রদর্শন।“ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি ছিলেন বাংলার আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর স্বপ্ন ছিল শক্তিশালী, আত্মনির্ভর ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলা। আজকের এই সরকার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের অন্যতম তাৎপর্য ছিল বিজেপির ঐতিহাসিক শিকড়কে সামনে আনা। বঙ্গীয় জনজাগরণের ধারাকে বিজেপি নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে।ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভাবধারা, ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীকালে বিজেপির উত্থান— এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যকে যুক্ত করার স্পষ্ট প্রচেষ্টা দেখা যায়।
২৫শে বৈশাখে শপথ গ্রহণকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে নতুন সরকারের শপথ যেন এক বিশেষ বার্তা বহন করছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে যে তারা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কেও নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়।রবীন্দ্রনাথের “সভ্যতার সংকট” থেকে “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য”— এই মানবতাবাদী ভাবনাকে সামনে রেখে বাংলার নতুন রাজনৈতিক দিশা নির্ধারণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।এই নির্বাচনে বিজেপির জয়কে অনেকেই শুধু রাজনৈতিক পালাবদল হিসেবে দেখছেন না। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান, শিল্পোন্নয়ন, দুর্নীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই ফলাফলকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
গ্রামের কৃষক থেকে শহরের মধ্যবিত্ত যুবক— বহু মানুষ নতুন সরকারের কাছে বড় প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন।বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চাকরি, স্টার্টআপ, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি প্রবল।নতুন সরকারের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে পারে— আইনশৃঙ্খলা,শিল্প ও বিনিয়োগ কর্মসংস্থান ,রাজনৈতিক হিংসা রোধ ,সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন এবং সীমান্ত সমস্যা দূর করা প্রভৃতি।
নতুন সরকারের অগ্রাধিকার আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি রাজ্যে নতুন শিল্পনীতি, বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পাঞ্চল পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা নেওয়া । দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চল, হলদিয়া বন্দর এবং উত্তরবঙ্গের পর্যটনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে।সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং বেসরকারি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বারবার “হিংসামুক্ত বাংলা”-র কথা বলেছেন। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।বাংলার লোকসংস্কৃতি, বাউল, কীর্তন, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও আদিবাসী সংস্কৃতিকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরার পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে।বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, চোরাচালান রোধ এবং নাগরিক পরিষেবা আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে বলে সূত্রের খবর।তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। কারণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাশার মাত্রাও অনেক বেড়ে গেল।
আজকের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে দিল্লি ও কলকাতার সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। দীর্ঘদিনের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের পরিবর্তে “সহযোগিতামূলক উন্নয়ন”-এর বার্তা দেওয়া হয়েছে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথমেই জোড়াসাঁকো গিয়ে সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানান তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে প্রশাসনিক বৈঠক সারেন মুখ্য সচিব ,ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে । বার্তা দেন সকলকে নিয়ে চলার ,নির্দেশ দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভেন্দু অধিকারী বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন ‘কথা কম কাজ বেশি করতে হবে’।

জেলার সাথে সাথে কলকাতার রাস্তায় আজ মিশ্র আবেগের ছবি ধরা পড়ে। কেউ উচ্ছ্বসিত, কেউ আশাবাদী, কেউ আবার সতর্ক অপেক্ষায়।হাওড়ার এক কলেজছাত্র বলেন,“আমরা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন চাইনি, কাজ চাই। যদি নতুন সরকার সত্যিই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।”বীরভূম থেকে আসা এক সাংস্কৃতিক কর্মী বলেন,“আজকের অনুষ্ঠানে বাংলার সংস্কৃতিকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা ভালো লেগেছে। তবে সংস্কৃতির নামে বিভাজন নয়, ঐক্য চাই।”রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আজকের দিনটি শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তনের দিন নয়। এটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে রাজ্যের পাশাপাশি বীরভূমেও ধরা পড়েছে আনন্দের উৎসবের চেহারা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে যেমন ঝালমুড়ির স্টল করা হয়েছে তেমনি সিউড়িতে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি কর্মী সমর্থকদের উৎসাহে বিতরণ করা হয়েছে ঝাল মুড়ি। এখানেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একইসঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে।

একদিকে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদের জাতীয়তাবাদ— এই দুই ধারাকে মিলিয়ে বিজেপি বাংলায় নতুন রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণের চেষ্টা করছে।এখন দেখার, এই নতুন সরকার কতটা বাস্তব উন্নয়ন ঘটাতে পারে এবং কত দ্রুত মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে। কারণ বাংলার মানুষ আবেগপ্রবণ হলেও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন।আজ বিগ্রেডের মঞ্চে যে নতুন সূর্যের উদয়ের কথা বলা হল, আগামী দিনে সেই আলো সত্যিই বাংলার প্রতিটি ঘরে পৌঁছয় কিনা— সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্থান নির্বাচন ও সাংবিধানিক উপস্থিতি। কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড-এ অনুষ্ঠিত হয় এই বিশাল শপথ অনুষ্ঠান, যেখানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে কার্যত জাতীয় রাজনৈতিক সমাবেশের আবহ তৈরি হয়। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাধিক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক জনসভার সাক্ষী এই ব্রিগেড ময়দান আজ আবারও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইল।




